আদি গঙ্গা ও আটঘরা প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র: বারুইপুরের লুপ্ত প্রাচীন ইতিহাস
আদি গঙ্গার তীরে অবস্থিত প্রাচীন আটঘরা প্রত্নতাত্ত্বিক খননক্ষেত্রের ইতিহাস, মৌর্য-শুঙ্গ-কুষাণ যুগের রোলেটেড মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির ফলক এবং আন্তর্জাতিক নদী বাণিজ্যের রোমাঞ্চকর বিবরণ।

খবরটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
বারুইপুরের বন্ধুদের কাছে সত্য খবর পৌঁছে দিন
বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন
আজকের ব্যস্ত বারুইপুর মহকুমা শুধুমাত্র একটি আধুনিক শহর বা ট্রানজিট কেন্দ্র নয়, এর ভূগর্ভে লুকিয়ে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ঐতিহাসিকদের মতে, আদি গঙ্গা (প্রাচীন ভাগীরথী নদী)-র উর্বর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জনপদ প্রাচীন যুগে বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের এক অন্যতম প্রধান পোতাশ্রয় ছিল। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে বারুইপুরের কাছে অবস্থিত 'আটঘরা' (Atghara) প্রত্নতাত্ত্বিক খননক্ষেত্রে।
আদি গঙ্গার প্রাচীন গতিপথ ও বারুইপুরের ভৌগোলিক অবস্থান
বর্তমানে আদি গঙ্গা সংকীর্ণ খালের মতো মনে হলেও, অতীতে এটিই ছিল গঙ্গার মূল বেগবান জলধারা। প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন ও রাঢ় অঞ্চলের বাণিজ্যতরীগুলি এই আদি গঙ্গা পথেই কালীঘাট, বোড়াল, বারুইপুর, ছত্রভোগ হয়ে বঙ্গোপসাগরে পাড়ি দিত। পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি বিপ্রদাস পিপলাইয়ের 'মনসামঙ্গল' এবং মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর 'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যে আদি গঙ্গার তীরবর্তী এই বাণিজ্যকেন্দ্রগুলির বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়। বারুইপুরের কাছে আদি গঙ্গার প্রাচীন খাতের অবশিষ্টাংশ এখনও এই প্রাচীন সমৃদ্ধির সাক্ষ্য বহন করে।
আটঘরা প্রত্নক্ষেত্রের আবিষ্কার ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
বারুইপুর জংশন থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আটঘরা গ্রামটিতে ১৯৫০-এর দশকে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান মেলে। পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়াম এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব অধিকারের যৌথ উদ্যোগে এখানে বৈজ্ঞানিক খননকার্য চালানো হয়।
খননের ফলে যে সমস্ত প্রত্নসামগ্রী উদ্ধার হয়েছে, তা প্রমাণ করে আটঘরা ছিল উত্তর ২৪ পরগনার বিখ্যাত চন্দ্রকেতুগড় (Chandraketugarh) সভ্যতার সমসাময়িক এবং সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী বন্দর কেন্দ্র। এখানে প্রায় চারটি ঐতিহাসিক স্তরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে:
১. মৌর্য যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক)
২. শুঙ্গ যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক থেকে ১ম শতক)
৩. কুষাণ যুগ (খ্রিস্টীয় ১ম থেকে ৩য় শতক)
৪. গুপ্ত ও উত্তর-গুপ্ত যুগ (খ্রিস্টীয় ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ শতক)
আটঘরা থেকে উদ্ধার হওয়া প্রাচীন নিদর্শন
আটঘরা প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র থেকে উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলি প্রাচীন ভারতীয় চারুকলা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন:
- পোড়ামাটির ফলক (Terracotta Plaques): অসাধারণ সূক্ষ্ম শিল্পসমৃদ্ধ কুষাণ ও শুঙ্গ যুগের যক্ষী, নাগমূর্তি এবং মাতৃকা দেবীর টেরাকোটা ভাস্কর্য।
- রোলেটেড মৃৎপাত্র (Rouletted Pottery): রোমান বাণিজ্যের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী বিখ্যাত রোলেটেড ও কালো চকচকে মৃৎপাত্র (NBPW)।
- রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রা: মৌর্য ও শুঙ্গ যুগের ছাঁচভাঙা রুপোর মুদ্রা (Punch-marked coins) এবং কুষাণ আমলের ঢালাই তাম্রমুদ্রা।
- মূল্যবান পাথরের পুঁতি (Beads): কার্নেলিয়ান, জ্যাসপার, আগাট এবং অ্যামেথিস্ট পাথরে তৈরি অত্যন্ত সূক্ষ্ম অলঙ্কার পুঁতি, যা তৎকালীন উন্নত হস্তশিল্পের পরিচয় দেয়।
- ব্রাহ্মী লিপির সিলমোহর: প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপিতে খোদিত পোড়ামাটির সিলমোহর, যা বাণিজ্য শুল্ক এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আটঘরা
আটঘরা ছিল মূলত একটি অভ্যন্তরীণ নৌবন্দর। মেদিনীপুরের তমলুক (তাম্রলিপ্ত) এবং উত্তর ২৪ পরগনার চন্দ্রকেতুগড়ের মতোই আটঘরা থেকে আদি গঙ্গার মাধ্যমে সুবর্ণভূমি (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) এবং রোমান সাম্রাজ্যের সাথে পণ্য বিনিময় চলত। এখানকার পোড়ামাটির পাত্র ও ধাতব ধ্বংসাবশেষ প্রমাণ করে যে এটি একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও পরিকল্পিত নগরকেন্দ্র ছিল।
বর্তমান সংরক্ষণ পরিস্থিতি ও ভ্রমণ পরিক্রমা
আটঘরা থেকে প্রাপ্ত বহু অমূল্য প্রাচীন নিদর্শন বর্তমানে কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়াম অফ ইন্ডিয়ান আর্ট এবং রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।
- কীভাবে যাবেন: বারুইপুর রেলওয়ে স্টেশন বা কাছারি মোড় থেকে অটো বা টোটো রিজার্ভ করে মাদরাট রোড ধরে খুব সহজেই আটঘরা গ্রামে পৌঁছানো যায়।
- ঐতিহাসিকদের আবেদন: স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে আটঘরায় একটি স্থায়ী আঞ্চলিক প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা ও সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এই প্রাচীন ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত হতে পারে।
জরুরি ঐতিহাসিক ও নাগরিক তথ্য
- মহকুমা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, বারুইপুর: ০৩৩-২৪৩৩-৮২১০
- বারুইপুর টাউন লাইব্রেরি ও আর্কাইভ: ০৩৩-২৪৩৩-৮২৬০
- স্থানীয় নাগরিক তথ্যবাতায়ন: [email protected]
সম্পাদকীয় স্বচ্ছতা ও ফ্যাক্ট-চেক নীতি: বারুইপুর অনলাইন বার্তা ডেস্কের নিজস্ব অনুসন্ধানী ও বিশ্বস্ত স্থানীয় সংবাদ সূত্রের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনটি সংকলিত ও পরিমার্জিত করা হয়েছে। জনস্বার্থে প্রচারিত এই তথ্যে কোনো সংশোধন থাকলে আমাদের সাথে নির্দ্বিধায় যোগাযোগ করুন।

শুভ্রনীল নস্কর(Subhranil Naskar)
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক • মহকুমা প্রশাসন, নগরোন্নয়ন ও রাজনীতি
দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও বারুইপুর মহকুমার সমাজ, পৌর রাজনীতি ও আঞ্চলিক উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক। দীর্ঘ ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে মহকুমার জনস্বার্থ ও অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতায় যুক্ত।