সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত বারুইপুর: 'দুর্গেশনন্দিনী' ও 'কপালকুণ্ডলা' রচনার ইতিহাস
বারুইপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দিনলিপি, বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী' ও 'কপালকুণ্ডলা' রচনার পটভূমি এবং বারুইপুরের অবিচ্ছেদ্য সাহিত্যিক ঐতিহ্য।

খবরটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
বারুইপুরের বন্ধুদের কাছে সত্য খবর পৌঁছে দিন
বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর এক অবিস্মরণীয় স্থানের অধিকারী। কারণ এই মাটিতেই রচিত হয়েছিল আধুনিক বাংলা উপন্যাসের ভিত্তিপ্রস্তর। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা সাহিত্যের যুগস্রষ্টা ঔপন্যাসিক সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বারুইপুরে ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আর সেই কর্মজীবনের দিনগুলিতেই রচিত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী' ও 'কপালকুণ্ডলা'।
বারুইপুরে বঙ্কিমচন্দ্রের পদার্পণ ও ম্যাজিস্ট্রেসি দিনগুলি
১৮৬৪ সালের মার্চ মাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বারুইপুর মহকুমার শাসনভার গ্রহণ করেন এবং ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত একটানা প্রায় পাঁচ বছর এখানে কর্মরত ছিলেন। সেই সময় বারুইপুর ছিল সুন্দরবন ও দক্ষিণবঙ্গের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র।
আদি গঙ্গার তীরবর্তী শান্ত, শ্যামলিমাময় পরিবেশ এবং পুরনো নীলকুঠি ও রাজবাড়ির ঐতিহাসিক আবহ বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টিশীল মননকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। তৎকালীন বারুইপুর মহকুমা আদালত ও নীলকুঠির কাছে তাঁর সরকারি বাংলোতেই তিনি নিভৃতে সাহিত্য সাধনায় নিমগ্ন হতেন।
'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫): আধুনিক বাংলা উপন্যাসের জন্ম
১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বাংলা উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী'। ঐতিহাসিকদের মতে, এই কালজয়ী উপন্যাসের সিংহভাগই রচিত হয়েছিল বারুইপুরের নির্জন বাংলোতে বসে।
- উপন্যাসের পটভূমিতে মোঘল-পাঠান সংঘাত এবং গড় মান্দারনের দুর্গ থাকলেও, দুর্গের যে রোমান্টিক ও রহস্যময় বর্ণনা বঙ্কিমচন্দ্র দিয়েছিলেন, তার অনুপ্রেরণা ছিল বারুইপুরের ঐতিহাসিক রায়চৌধুরী রাজবাড়ি ও প্রাচীন নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ।
- তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের বিপরীতে বাংলা গদ্যের এক সম্পূর্ণ নতুন গতিশীল ভাষা বারুইপুরের মাটিতে বসেই তিনি তৈরি করেছিলেন।
'কপালকুণ্ডলা' (১৮৬৬) এবং সুন্দরবনের পটভূমি
'দুর্গেশনন্দিনী'র অভাবনীয় সাফল্যের পর ১৮৬৬ সালে বারুইপুরেই রচিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় মাস্টারপিস 'কপালকুণ্ডলা'।
- তৎকালীন সময়ে বারুইপুর ছিল সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। সরকারি দায়িত্ব পালনে তাঁকে বারবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সমুদ্রোপকূল, হিজলি ও সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে যেতে হতো।
- সমুদ্রতীরের সেই ভয়াল সৌন্দর্য, কাপালিক সাধনা এবং অরণ্যচারিণী নারী চরিত্র 'কপালকুণ্ডলা' সৃষ্টির পেছনে বারুইপুর মহকুমার এই আঞ্চলিক প্রকৃতি ও লোকবিশ্বাসের গভীর প্রভাব ছিল।
বারুইপুরের সাহিত্য ঐতিহ্য ও বঙ্কিম স্মারক
বারুইপুর শহরের সমাজ ও সংস্কৃতিতে বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতি আজও অমলিন। এখানকার বহু বিদগ্ধ পণ্ডিত, পুরোহিত ও সাধারণ মানুষের সাথে বঙ্কিমচন্দ্রের গভীর সখ্য গড়ে উঠেছিল। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, রায়চৌধুরী পরিবারের পণ্ডিতদের সাথে তিনি প্রায়শই শাস্ত্র ও সাহিত্য আলোচনায় বসতেন।
বর্তমানে বারুইপুর মহকুমা আদালত সংলগ্ন এলাকা এবং ঐতিহাসিক রাসমাঠ ও পুরশ্রী অঞ্চলে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন সংরক্ষণের উদ্যোগ স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের গর্বের বিষয়।
ঐতিহ্য মূল্যায়ন: বারুইপুর কেবলমাত্র দক্ষিণবঙ্গের একটি দ্রুত বর্ধনশীল আধুনিক শহরই নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের আধুনিকায়নের তীর্থভূমি।
মৌসুমী সেনগুপ্ত(Mousumi Sengupta)
সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিক্ষা প্রতিনিধি • ঐতিহ্য, রাসমেলা, শিক্ষা ও সমাজসেবা
বারুইপুরের ঐতিহাসিক রাসমেলা, রাজবাড়ি, প্রাচীন লোকউৎসব, বিদ্যালয় ও স্থানীয় সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিবন্ধকার।
প্রতিবেদনের ছবি সংকলন (2টি ছবি)

