বারুইপুরের বিখ্যাত পেয়ারা ও লিচু: চাষের ইতিহাস, বাগান ও পাইকারি ফলের বাজার গাইড
বারুইপুরের বিশ্বখ্যাত রসালো পেয়ারা ও গ্রীষ্মের মিষ্টি লিচুর ইতিহাস, হরিঝা ও বোম্বাই জাতের পরিচয়, খাসমল্লিক পাইকারি ফলের আড়ত এবং বাগান ভ্রমণের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।

খবরটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
বারুইপুরের বন্ধুদের কাছে সত্য খবর পৌঁছে দিন
বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন
বারুইপুরের নাম শুনলেই যে রসালো স্বাদের কথা সবার আগে মনে পড়ে, তা হলো এখানকার বিশ্বখ্যাত 'বারুইপুরী পেয়ারা' এবং গ্রীষ্মের মিষ্টি লিচু। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার এই সমৃদ্ধ জনপদ শুধুমাত্র প্রশাসনিক বা ট্রানজিট কেন্দ্র নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি পশ্চিমবঙ্গের প্রধান উদ্যানপালন ও ফল বিপণন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। আদি গঙ্গার উর্বর পলিমাটি এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু বারুইপুরের পেয়ারা ও লিচুর মিষ্টতা এবং গুণমানে এনে দিয়েছে এক অনন্য ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য।
বারুইপুরে পেয়ারা ও লিচু চাষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই বারুইপুর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ফল চাষের সূচনা ঘটে। স্থানীয় ঐতিহাসিকদের মতে, আদি গঙ্গার অববাহিকায় পলিযুক্ত দোআঁশ মাটির কারণে এখানকার মাটিতে ফলনের মিষ্টতা ও আর্দ্রতা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ব্রিটিশ আমলে এবং পরবর্তীকালে স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় ধোপাগাছি, সুবুদ্ধিপুর, কল্যাণপুর, বেগমপুর ও শিখরবালির বিস্তীর্ণ জমিতে পেয়ারা ও লিচু বাগান গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে রাজ্য সরকারের উদ্যানপালন দপ্তর এবং বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বারুইপুর অঞ্চলের পেয়ারা উৎপাদন প্রযুক্তিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে।
জনপ্রিয় জাত ও ফলনের বৈশিষ্ট্য
বারুইপুর অঞ্চলে প্রধানত দুটি ফলের ব্যাপক বাণিজ্যিক চাষ হয়:
১. পেয়ারা (Guava)
- হরিঝা (Harijha): বারুইপুরের পেয়ারার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত। এর ত্বক অত্যন্ত পাতলা, শাঁস নরম, সুগন্ধযুক্ত এবং স্বাদ অতিশয় মিষ্টি।
- বারুইপুর স্পেশাল (Baruipur Round): মাঝারি থেকে বড় আকারের সুষম গোলাকার ফল। বীজ তুলনামূলকভাবে কম এবং বাণিজ্যিক পরিবহনের জন্য অত্যন্ত টেকসই।
- এল-৪৯ বা সর্দার (L-49): খোসা সামান্য অমসৃণ হলেও শাঁস অত্যন্ত রসালো ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ।
- ফলনের মরশুম: বছরে দু'বার প্রধান ফলন হয়—বর্ষাকালীন (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) এবং শীতকালীন (নভেম্বর থেকে জানুয়ারি)। শীতের পেয়ারার শাঁস বেশি নিরেট এবং মিষ্টতা তীব্র হয়।
২. লিচু (Litchi)
- বোম্বাই লিচু (Bombai Litchi): গাঢ় লালচে খোসা, পাতলা আঁটি এবং রসালো মিষ্টি শাঁসের জন্য বারুইপুরের বোম্বাই লিচু বিখ্যাত।
- মুজাফফরপুর হাইব্রিড ও চায়না জাত: মে মাসের শুরু থেকে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এলাকার বাগানগুলি লিচুর সৌরভে ভরে ওঠে।
খাসমল্লিক পাইকারি ফল মান্ডি: দক্ষিণবঙ্গের ফলের রাজধানী
কুলপী রোডের ধারে অবস্থিত খাসমল্লিক পাইকারি ফল বাজার (Khashmallik Fruit Market) সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের বৃহত্তম পেয়ারা বিপণন আড়ত।
- ভোরের নিলামের দৃশ্য: প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে পার্শ্ববর্তী কয়েক ডজন গ্রাম থেকে চাষিরা সাইকেল, ভ্যান ও ট্রলিতে করে টাটকা পেয়ারা ও লিচুর ঝুড়ি নিয়ে বাজারে হাজির হন।
- দৈনিক লেনদেন: পিক সিজনে প্রতিদিন কয়েকশো টন পেয়ারা এই আড়ত থেকে নিলামের মাধ্যমে কলকাতা, শিয়ালদহ কোল্ড মার্কেট, মেদিনীপুর, হাওড়া এমনকি প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় চালান হয়।
- ন্যায্য মূল্যের সুবিধা: সরাসরি কৃষকের হাত থেকে ফল আসায় এখানে সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা পাইকারি দরে টাটকা ফল সংগ্রহ করতে পারেন।
ফলপ্রেমীদের বাগান ভ্রমণ ও কেনার অভিজ্ঞতা
কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বহু প্রকৃতিপ্রেমী সপ্তাহান্তে বারুইপুরের পেয়ারা ও লিচু বাগান দেখতে আসেন:
- কীভাবে পৌঁছাবেন: শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা থেকে লোকাল ট্রেনে বারুইপুর জংশনে নেমে স্টেশন রোড থেকে সরাসরি অটো বা টোটোয় খাসমল্লিক, ধোপাগাছি বা মল্লিকপুর যাওয়া যায়।
- বাগান ভ্রমণের সেরা সময়: পেয়ারা দেখার জন্য বর্ষার শেষ ও শীতকাল এবং লিচুর জন্য মে-জুন মাস সবচেয়ে উপযুক্ত।
- সরাসরি চাষির থেকে কেনা: বাগান মালিকদের অনুমতি সাপেক্ষে সরাসরি গাছ থেকে পাড়া টাটকা পেয়ারা ও লিচু কেনা এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও প্রক্রিয়াকরণ পরিকাঠামো
বর্তমানে বারুইপুরের ফলচাষিদের প্রধান দাবি হলো আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ এবং পেয়ারা জ্যাম, জেলি ও ফ্রুট জুস প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটের সম্প্রসারণ। স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি সরকারি সহায়তায় প্রক্রিয়াকরণ শুরু করেছে, যা এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।
জরুরি তথ্য ও প্রশাসনিক যোগাযোগ
- বারুইপুর মহকুমা উদ্যানপালন দপ্তর (Horticulture Office): ০৩৩-২৪৩৩-৮২৩০
- বারুইপুর কিষাণ মান্ডি ও কৃষি আধিকারিক: ০৩৩-২৪৩৩-৮২৪৫
- জরুরি রেল ও ট্রানজিট সহায়তা: ১৩৯ (শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা)
সম্পাদকীয় স্বচ্ছতা ও ফ্যাক্ট-চেক নীতি: বারুইপুর অনলাইন বার্তা ডেস্কের নিজস্ব অনুসন্ধানী ও বিশ্বস্ত স্থানীয় সংবাদ সূত্রের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনটি সংকলিত ও পরিমার্জিত করা হয়েছে। জনস্বার্থে প্রচারিত এই তথ্যে কোনো সংশোধন থাকলে আমাদের সাথে নির্দ্বিধায় যোগাযোগ করুন।
মৌসুমী সেনগুপ্ত(Mousumi Sengupta)
সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিক্ষা প্রতিনিধি • ঐতিহ্য, রাসমেলা, শিক্ষা ও সমাজসেবা
বারুইপুরের ঐতিহাসিক রাসমেলা, রাজবাড়ি, প্রাচীন লোকউৎসব, বিদ্যালয় ও স্থানীয় সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিবন্ধকার।