বারুইপুর ভ্রমণ গাইড: কলকাতা সংলগ্ন সেরা ডে-ট্রিপ, দর্শনীয় স্থান ও খাঁটি অভিজ্ঞতা
৩০০ বছরের ঐতিহাসিক রাজবাড়ি, মহাপ্রভুতলা, শিবাণী পীঠ, আদি গঙ্গার পাখি দর্শন, বিখ্যাত পেয়ারা মাখা ও উত্তরভাগ পাম্প হাউস—কলকাতা থেকে মাত্র ২৫ কিমিতে বারুইপুর ভ্রমণের সম্পূর্ণ গাইড ও রেডিমেড রুট প্ল্যান।

খবরটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
বারুইপুরের বন্ধুদের কাছে সত্য খবর পৌঁছে দিন
বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন
বারুইপুর (Baruipur) এমন এক জনপদ যা কোনও ছকবাঁধা তালিকা মেনে নয়, বরং তার শতবর্ষের ইতিহাস, মাটির গন্ধ আর খাঁটি জীবনযাত্রার আমেজ নিতে দেখতে হয়। এখানে রয়েছে ৩০০ বছরের প্রাচীন জমিদার রায়চৌধুরী রাজবাড়ি—যেখানে আজও রূপোর পাখা আর রূপোর ঝাঁটা দিয়ে দেবীর বিসর্জন শোভাযাত্রা বের হয়; রয়েছে ভাগীরথী-আদি গঙ্গার স্মৃতিবিজড়িত মহাপ্রভুতলা—যেখানে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে পুরীযাত্রার পথে স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু পদার্পণ করেছিলেন; রয়েছে সাহিত্যের অমর ইতিহাস—যেখানে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন তাঁর প্রথম দুই কালজয়ী উপন্যাস *দুর্গেশনন্দিনী* ও *কপালকুণ্ডলা*; আর অবশ্যই রয়েছে জিআই ট্যাগযুক্ত বিশ্বখ্যাত বারুইপুরের পেয়ারা—যার স্বাদ মুখে লেগে থাকে।
শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই শহর দক্ষিণ কলকাতার নাগরিক কোলাহল আর সুন্দরবনের বদ্বীপ গ্রামীণ জীবনের এক অপূর্ব সেতুবন্ধন। কলকাতা থেকে একদিনের রিফ্রেশিং ডে-ট্রিপ, সপরিবারে পিকনিক কিংবা ছুটির দিনে রোমাঞ্চকর উইকএন্ড ভ্রমণের জন্য বারুইপুর এক আদর্শ গন্তব্য।
[!NOTE]
Read this guide in English: Click here to read the complete English guide: Things to Do in Baruipur: A Day-Trip Guide from Kolkata
এক নজরে বারুইপুরের সেরা অভিজ্ঞতা ও দর্শনীয় স্থান
| গন্তব্য ও অভিজ্ঞতা | কীসের জন্য বিখ্যাত | প্রয়োজনীয় সময় | সঠিক অবস্থান |
|---|---|---|---|
| বারুইপুর রাজবাড়ি (রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ি) | ৩০০ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য, দুর্গোৎসব ও রূপোর ঝাঁটা-পাখার বিসর্জন | ৪৫–৬০ মিনিট | কুলপি রোড / রাজবাড়ি চত্বর |
| মহাপ্রভুতলা, সদাব্রত ঘাট ও কটকী পুকুর | শ্রীচৈতন্যদেবের পদধূলিধন্য বৈষ্ণব তীর্থ ও অনন্ত আচার্যের শ্রীপাট | ৩০–৪৫ মিনিট | মধ্য বারুইপুর (আদি গঙ্গার পাড়) |
| শিবাণী পীঠ (Shibani Pith) | জাগ্রত কালীমন্দির, মনোরম সান্ধ্য আরতি ও আলোকসজ্জা | ৩০–৪৫ মিনিট | কুলপি রোড |
| বারুইপুরের পেয়ারা ও কাসুন্দি মাখা | জিআই ট্যাগড বিশ্বখ্যাত ফল, অপূর্ব স্বাদের পেয়ারা মাখা | ৩০ মিনিট | স্টেশন রোড, পুরাতন বাজার ও বাগান |
| ধপধপি দক্ষিণেশ্বর মন্দির | নবরত্ন স্থাপত্যশৈলী, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিরূপ ও শান্ত পরিবেশ | ৪৫ মিনিট | ধপধপি গ্রাম পঞ্চায়েত (পশ্চিম বারুইপুর) |
| পুরাতন বাজার (Puratan Bazar) | ২০০ বছরের ঐতিহাসিক পাইকারি বাজার, টাটকা মাছ ও পানের বরজ | ১–১.৫ ঘণ্টা | কুলপি রোড |
| বারুইপুর ক্যানেল ও আদি গঙ্গার জলাভূমি | পক্ষীদর্শন: বিরল লাল মুনিয়া (Red Avadavat), পরিযায়ী পাখি ও মেঠো পথ | ১.৫–২ ঘণ্টা | ক্যানেল পাড় (সুভাষগ্রাম/মাদারাট অভিমুখী) |
| আরণ্যক ইকো-পার্ক (মিনি জু) | সপরিবারে পিকনিক, হরিণ ও পক্ষিশালা, শিশুদের খেলার পার্ক | ১.৫–২ ঘণ্টা | বারুইপুর–ক্যানিং রোড |
| হ্যাপী ভ্যালি লেক ও রিসোর্ট | লেকের পাড়ে বিনোদন, প্যাডেল বোটিং ও পারিবারিক ছুটি | ২–৩ ঘণ্টা | কুলপি রোড / বাইপাস সংলগ্ন |
| নীলদীপ গার্ডেন (Neeldeep Garden) | মনোরম গ্রামীণ পিকনিক গার্ডেন ও সবুজ প্রান্তর | ২–৩ ঘণ্টা | পদ্মপুকুর / গ্রামীণ অঞ্চল |
| উত্তরভাগ পাম্প হাউস (Uttarbhag) | ঐতিহাসিক মেগা ড্রেনেজ ক্যানেল, বিশাল জলাশয় ও সুন্দর পিকনিক স্পট | ১–২ ঘণ্টা | উত্তরভাগ (ক্যানিং রোড হয়ে) |
| ক্যাথেড্রাল অফ সেন্ট টেরিজা (বারুইপুর চার্চ) | রোমান ক্যাথলিক ডায়োসিস, মাদার তেরেসা স্মারক ক্যাথেড্রাল | ৩০ মিনিট | কুলপি রোড সংলগ্ন |
| বারুইপুর রাসমাঠ ও ঐতিহ্যবাহী রাসমেলা | শতবর্ষের বিশাল শীতকালীন মেলা, নাগরদোলা, যাত্রা ও খাবারের স্টল | ১.৫–৩ ঘণ্টা | রাসমাঠ প্রাঙ্গণ (কার্তিক পূর্ণিমা / নভেম্বর) |
১. ইতিহাস, জমিদারি ঐতিহ্য ও সাহিত্যের সোনালী পথ
বারুইপুর রাজবাড়ি (রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ি)
বারুইপুরের সবচেয়ে প্রাচীন ও আকর্ষক ঐতিহাসিক নিদর্শন হলো রায়চৌধুরী রাজবাড়ি। মূল রাজপুরের জমিদার পরিবার পরবর্তীতে বারুইপুরের সুবিশাল এলাকার শাসনভার লাভ করেন। লাল ইটের প্রাচীন খিলান, নাটমন্দির, আটচালা দুর্গামন্দির এবং ঐতিহাসিক কামান এই চত্বরে আজও অতীত জমিদারি ঐশ্বর্যের সাক্ষ্য বহন করছে। সত্যজিৎ রায়ের ঐতিহ্যবাহী পটভূমি থেকে শুরু করে বহু জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা ও ধারাবাহিকের শ্যুটিং হয়েছে এই রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে।
- বিসর্জনের অনন্য ঐতিহ্য: এখানকার ৩০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন দুর্গাপূজায় এক অপূর্ব রীতি প্রচলিত—বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রায় দেবীর সামনে রূপোর পাখা দিয়ে বাতাস করা হয় এবং রূপোর ঝাঁটা দিয়ে পথ পরিষ্কার করতে করতে শোভাযাত্রা এগিয়ে চলে।
- ভ্রমণকারীদের জন্য পরামর্শ: রাজবাড়ির একাংশে আজও পরিবারের উত্তরসূরিরা বসবাস করেন। তাই বহিরঙ্গণ ও ঠাকুরদালান ঘুরে দেখার সময় শালীনতা বজায় রাখুন এবং ব্যক্তিগত অংশে প্রবেশের আগে অনুমতি নিন।
- যাতায়াত: বারুইপুর জংশন স্টেশন থেকে টোটো বা অটোতে মাত্র ৫-৭ মিনিট।
মহাপ্রভুতলা, সদাব্রত ঘাট ও কটকী পুকুর
১৫১০ খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপ থেকে পুরীধাম যাত্রাকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রাচীন ভাগীরথী-আদি গঙ্গার জলপথ ধরে বারুইপুরের অতিসারা গ্রামে উপস্থিত হন। সেখানে তাঁর পরম ভক্ত অনন্ত আচার্যের শ্রীপাটে তিনি আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন।
- দর্শনীয় স্থান: ঐতিহাসিক মহাপ্রভুতলা মন্দির, প্রাচীন সদাব্রত ঘাট এবং বিখ্যাত কটকী পুকুর—যেখানে স্নান সেরে মহাপ্রভু কটক ও ছত্রভোগের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। বটবৃক্ষের ছায়ায় ঘেরা এই স্থান বৈষ্ণব ভক্ত ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য পরম শান্তির জায়গা।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য সৃষ্টি
বাংলা সাহিত্যের কালপুরুষ ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত বারুইপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ব্রিটিশ প্রশাসনের এই দায়িত্ব পালনকালীন সময়েই তিনি রচনা করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস ***দুর্গেশনন্দিনী*** (১৮৬৫) এবং অপর বিখ্যাত সৃষ্টি ***কপালকুণ্ডলা*** (১৮৬৬)। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত অঞ্চলটি আজও 'ঋষি বঙ্কিম নগর' নামে খ্যাত এবং স্থানীয় টাউন লাইব্রেরিতে তাঁর নানা ঐতিহাসিক নথিপত্র সংরক্ষিত রয়েছে।
ক্যাথলিক ডায়োসিস ক্যাথেড্রাল (বারুইপুর চার্চ)
কুলপি রোডে অবস্থিত এই বিশাল রোমান ক্যাথলিক ক্যাথেড্রালটি দক্ষিণবঙ্গের খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের এক প্রধান কেন্দ্র। মাদার তেরেসার স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত বৃহত্তর কলকাতার অন্যতম প্রধান এই চার্চে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাগান, রঙিন কাঁচের জানালা (Stained Glass) এবং প্রার্থনাকক্ষ।
২. আধ্যাত্মিক শান্তি ও জাগ্রত মন্দির দর্শন
শিবাণী পীঠ (Shibani Pith)
কুলপি রোডের উপর অবস্থিত শিবাণী পীঠ বারুইপুরের অন্যতম জাগ্রত শক্তিক্ষেত্র। প্রতিদিন বহু ভক্ত সমবেত হলেও মঙ্গলবার, শনিবার ও অমাবস্যার তিথিতে এখানে বিশেষ পুজো ও ভক্ত সমাগম ঘটে। বিশেষ করে সন্ধ্যারতির সময় ধূপ-ধুনো, প্রদীপের আলো ও ঢাকের বোলে মন্দির প্রাঙ্গণ এক স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে।
ধপধপি দক্ষিণেশ্বর মন্দির
বারুইপুর পশ্চিম ব্লকের ধপধপি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত এই মন্দিরটি বিখ্যাত দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী কালীমন্দিরের স্থাপত্য আদলে তৈরি। নয়টি চূড়াবিশিষ্ট (নবরত্ন) এই শান্ত গ্রামীণ মন্দির চত্বরটি শহর থেকে সামান্য দূরে এক স্নিগ্ধ আধ্যাত্মিক অনুভূতির সৃষ্টি করে।
৩. কৃষি ঐতিহ্য, মেঠো হাট ও খাঁটি খাবারের আস্বাদ
জিআই ট্যাগড বারুইপুরের পেয়ারা ও কাসুন্দি পেয়ারা মাখা
বারুইপুরের মাটি ও আবহাওয়া গাঙ্গেয় পলিমাটিতে সমৃদ্ধ হওয়ায় এখানকার পেয়ারা স্বাদে, গন্ধে ও মিষ্টিতে অদ্বিতীয়। বারুইপুরের পেয়ারা সরকারিভাবে ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) ট্যাগ প্রাপ্ত। শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার লোকাল ট্রেনে হকারদের চেনা হাঁক আজও ট্রেনের যাত্রীদের নস্টালজিক করে তোলে: *"বারুইপুরের পেয়ারা খেলে হবে চেহারা!"* সম্প্রতি অপিডার (APEDA) সহযোগিতায় বারুইপুরের এই পেয়ারা সিঙ্গাপুর সহ আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি শুরু হয়েছে।
- জিভে জল আনা পেয়ারা মাখা: স্টেশন চত্বর কিংবা রেলগেটের মুখে টাটকা ডাঁসা পেয়ারা কেটে বিট নুন, কাঁচা লঙ্কা বাটা, ভাজা মশলা আর ঝাঁঝালো সরষে বাটা কাসুন্দি দিয়ে মেখে যে স্বাদ পাওয়া যায়, তা এক অনন্য অনুভূতি!
- বাগান ও কেনাকাটা: যাওয়ার সময় বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েক কেজি পেয়ারা কিনে নেওয়া মাস্ট।
সাতসকালে পুরাতন বাজারের হাট
কুলপি রোডে অবস্থিত ২০০ বছরের প্রাচীন পুরাতন বাজার হলো দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক অন্যতম ব্যস্ত গ্রামীণ পাইকারি বাজার।
- কী দেখবেন: ভোর ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে স্থানীয় ভেড়ি ও সুন্দরবনের খালবিল থেকে আসা জ্যান্ত মাছ, বাগদা চিংড়ি, কাঁকড়া, টাটকা সবজি এবং বিখ্যাত বারুইপুরের পানের বরজের মিষ্টি পান।
বারুইপুরের প্রাতরাশ, মিষ্টান্ন ও বাইপাস ক্যাফে
- সকালের জলখাবার: রেলগেট ও স্টেশন রোডের প্রাচীন মিষ্টির দোকানে গরম গরম রাধাবল্লভী বা হিংয়ের কচুরি-ছোলার ডাল এবং মুচমুচে জিলিপি দিয়ে ব্রেকফাস্ট।
- মিষ্টির স্বাদ: কামধেনু, হিমালয়া বা সূর্য সুইটসের নরম রসগোল্লা, বেকড সন্দেশ এবং ঘন লাল মিষ্টি দই।
- বাইপাসের আধুনিক ডাইনিং: বারুইপুর বাইপাস ধরে গড়ে উঠেছে প্রচুর ফ্যামিলি রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে—যেখানে আমিনিয়ার বিরিয়ানি, প্যারামাউন্টের মাল্টি-কুইজিন খাবার সহ আধুনিক সান্ধ্য আড্ডার সুবিধা রয়েছে।
৪. প্রকৃতি, পক্ষীদর্শন, লেক ও পারিবারিক চড়ুইভাতি
বারুইপুর ক্যানেল ও আদি গঙ্গার পাড়ে পাখি দেখা (Birdwatching)
আনন্দবাজার পত্রিকা ও ভারতের শীর্ষস্থানীয় পক্ষীবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বারুইপুরের আদি গঙ্গার ক্যানেল পাড় ও ঘাসবন পক্ষীপ্রেমীদের কাছে এক গোপন স্বর্গরাজ্য:
- পাখিদের মেলা: কলকাতার এত কাছে বিরল ও চোখজুড়ানো লাল মুনিয়া (Red Avadavat), বেঙ্গল বুশলার্ক, জলপিপি, নানা প্রজাতির বক এবং শীতের পরিযায়ী জলচর পাখি দেখতে এখানে প্রচুর ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার আসেন।
- সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের সাতসকাল (ভোর ৬টা থেকে ৮টা)।
আরণ্যক ইকো-পার্ক (বারুইপুর মিনি জু)
বারুইপুর পৌরসভার উদ্যোগে বারুইপুর-ক্যানিং রোডে অবস্থিত আরণ্যক সপরিবারে ছুটির দিন কাটানোর জন্য এক আদর্শ জায়গা। শিশুদের খেলার রাইড, চিত্রল হরিণের খামার, সুন্দর ফোয়ারা ও শীতকালীন ফুল প্রদর্শনীর জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
হ্যাপী ভ্যালি লেক ও রিসোর্ট
কুলপি রোড ও বাইপাস সংলগ্ন এই বিনোদন পার্কটিতে রয়েছে একটি বড় জলাশয়, যেখানে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা দেখা যায়। বোটিং ও সবুজ ঘাসের চত্বরে বসে পারিবারিক পিকনিকের সুযোগ এখানে পাওয়া যায়।
নীলদীপ গার্ডেন (Neeldeep Garden)
বারুইপুরের নির্জন গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে ওঠা নীলদীপ গার্ডেন পিকনিক ও ডে-আউটিংয়ের জন্য অত্যন্ত সুপরিচিত। সুসজ্জিত ফুলের বাগান ও খোলামেলা পরিবেশে একদিনের ছুটি চমৎকার কাটে।
ঐতিহাসিক উত্তরভাগ পাম্প হাউস (Uttarbhag)
ক্যানিং রোডের দিকে অবস্থিত উত্তরভাগ পাম্পিং স্টেশনটি ব্রিটিশ আমলের এক বিস্ময়কর জলনিষ্কাশন প্রকল্প। বিশাল জলকপাট, সুবিস্তীর্ণ ক্যানেল ও সবুজ বাঁধের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য এটিকে এক জনপ্রিয় অফবিট ডে-ট্রিপ স্পটে পরিণত করেছে।
৫. উৎসব ও সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডার
- বারুইপুর রাজবাড়ির দুর্গোৎসব (আশ্বিন / অক্টোবর): বিজয়া দশমীর রূপোর পাখা ও ঝাঁটা শোভাযাত্রা।
- ঐতিহাসিক বারুইপুর রাসমেলা (কার্তিক পূর্ণিমা / নভেম্বর): রাসমাঠ প্রাঙ্গণে প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী চলা দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যতম বৃহত্তম লোকমেলা। নাগরদোলা, পুতুলনাচ, যাত্রাপালা, হস্তশিল্প ও খাবারের স্টলে মুখরিত থাকে এই মেলা।
- চৈত্র সংক্রান্তির গাজন ও চড়ক মেলা (এপ্রিল): প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিবের গাজন ও চড়কের মেলা।
- বারুইপুর বইমেলা ও উৎসব: শীতকালে রাসমাঠ বা পদ্মপুকুর প্রাঙ্গণে আয়োজিত জেলা বইমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
সেরা ভ্রমণের সময়
- শীতকাল (নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি): তাপমাত্রা ১৪°C থেকে ২৫°C। ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে সেরা সময়—আনন্দদায়ক আবহাওয়া, রাসমেলা, আরণ্যকে পিকনিক ও ক্যানেলে পক্ষীদর্শন।
- বর্ষাকাল (জুলাই – সেপ্টেম্বর): সবুজ সতেজ গ্রামীণ রূপ, পেয়ারার প্রধান মরসুম ও মেঠো সৌন্দর্য।
- শরৎকাল (অক্টোবর): রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা ও সোনালী রোদের হালকা আমেজ।
রেডিমেড রুট প্ল্যান (Itinerary)
হাফ-ডে ট্যুর (৪–৫ ঘণ্টার ঝটিকা সফর)
- সকাল ০৮:৩০: শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে বারুইপুর পৌঁছান (সকাল ০৯:১৫)।
- সকাল ০৯:৩০: স্টেশন রোডে গরম কচুরি-জিলিপির জলখাবার।
- সকাল ১০:০০: টোটো নিয়ে সরাসরি বারুইপুর রাজবাড়ি দর্শন (৪৫ মিনিট)।
- সকাল ১১:০০: আদি গঙ্গার পাড়ে মহাপ্রভুতলা, সদাব্রত ঘাট ও কটকী পুকুর দর্শন (৪০ মিনিট)।
- সকাল ১১:৫০: কুলপি রোডে শিবাণী পীঠ দর্শন (২৫ মিনিট)।
- দুপুর ১২:৩০: স্টেশন চত্বরে টাটকা কাসুন্দি পেয়ারা মাখা আস্বাদন, মিষ্টি কেনা এবং কলকাতার ট্রেন ধরা।
ফুল-ডে ট্যুর (৭–৮ ঘণ্টার পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক সফর)
- সকাল ০৭:৩০: সাতসকালে পুরাতন বাজারে টাটকা কেনাকাটা ও গ্রামীণ হাটের মেজাজ উপভোগ।
- সকাল ০৯:০০: জলখাবার সেরে বারুইপুর ক্যানেল পাড়ে হালকা পক্ষীদর্শন ও মেঠো হাঁটা।
- সকাল ১০:৩০: রাজবাড়ি, মহাপ্রভুতলা এবং বারুইপুর ক্যাথলিক চার্চ দর্শন।
- দুপুর ০১:০০: বারুইপুর বাইপাসের রেস্তোরাঁয় জমিয়ে লাঞ্চ।
- দুপুর ০২:৩০: আরণ্যক ইকো-পার্ক বা হ্যাপী ভ্যালিতে রিল্যাক্স ও শিশুদের খেলাধুলো।
- বিকাল ০৪:৩০: সূর্যাস্তের আলোয় উত্তরভাগ পাম্প হাউসের ক্যানেল চত্বরে ঘুরে বেড়ানো ও ছবি তোলা।
- সন্ধ্যা ০৬:০০: শিবাণী পীঠে সন্ধ্যারতি দর্শন অথবা শীতের রাসমেলা ঘুরে পেয়ারা ও মিষ্টি নিয়ে ঘরের পথে রওনা।
যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ
- লোকাল ট্রেনে: শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা থেকে প্রতি ১০-১৫ মিনিট অন্তর বারুইপুর, ডায়মন্ড হারবার, নামখানা বা লক্ষ্মীকান্তপুরের ট্রেন পাওয়া যায় (ভাড়া মাত্র ১০ টাকা, সময় লাগে প্রায় ৪৫-৫০ মিনিট)।
- সড়কপথে: ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস ধরে কামালগাজী ফ্লাইওভার হয়ে বারুইপুর বাইপাস বা কুলপি রোড ধরে গাড়ি বা বাইকে ৪৫-৬০ মিনিট।
- লোকাল যাতায়াত: স্টেশনের বাইরে প্রচুর ই-রিকশা (টোটো) ও অটো মজুত রয়েছে। পুরো দিনের জন্য টোটো রিজার্ভ করলে ৩০০-৪০০ টাকার মধ্যে সমস্ত প্রধান দর্শনীয় স্থান ঘুরে নেওয়া যায়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
বারুইপুর কীসের জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত?
বারুইপুর তার জিআই ট্যাগযুক্ত মিষ্টি ও কুড়মুড়ে পেয়ারা, ৩০০ বছরের প্রাচীন রায়চৌধুরী রাজবাড়ি ও দুর্গোৎসব, ঐতিহাসিক মহাপ্রভুতলা, জাগ্রত শিবাণী পীঠ এবং দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী রাসমেলার জন্য বিখ্যাত।
কলকাতা থেকে একদিনে বারুইপুর ভ্রমণ কি সম্ভব?
হ্যাঁ, অত্যন্ত সহজে। শিয়ালদহ থেকে মাত্র ৪৫ মিনিটের ট্রেনযাত্রায় পৌঁছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইতিহাস, আধ্যাত্মিক স্থান, সুস্বাদু খাবার এবং পার্কের আনন্দ নিয়ে একই দিনে ফিরে যাওয়া যায়।
সেরা পেয়ারা মাখা কোথায় পাওয়া যায়?
বারুইপুর স্টেশনের ১ ও ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মের বাইরে, রেলগেটের মুখে এবং পুরাতন বাজারের প্রবেশদ্বারে খাঁটি কাসুন্দি, বিট নুন ও কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মাখা জিভে জল আনা পেয়ারা মাখা পাওয়া যায়।
বারুইপুর রাজবাড়ির ভেতরে কি যাওয়া যায়?
রাজবাড়ির ঠাকুরদালান, আটচালা নাটমন্দির এবং বহিরঙ্গণ প্রাঙ্গণ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। যেহেতু রাজবাড়ির কিছু অংশে পরিবারবর্গ আজও বসবাস করেন, তাই অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিগত অংশে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
সম্পর্কিত গাইড

শুভ্রনীল নস্কর(Subhranil Naskar)
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক • মহকুমা প্রশাসন, নগরোন্নয়ন ও রাজনীতি
দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও বারুইপুর মহকুমার সমাজ, পৌর রাজনীতি ও আঞ্চলিক উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক। দীর্ঘ ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে মহকুমার জনস্বার্থ ও অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতায় যুক্ত।