বারুইপুরের শতাব্দীপ্রাচীন জোড়া শিবমন্দির ও পোড়ামাটির মন্দির স্থাপত্য: প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও বর্তমান দশা
বারুইপুর পুরাতন বাজারের শতাব্দীপ্রাচীন জোড়া শিবমন্দিরের আটচালা স্থাপত্য, রামায়ণ ও পৌরাণিক টেরাকোটার অপূর্ব কারুকাজ এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্য প্রতিবেদন।

খবরটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
বারুইপুরের বন্ধুদের কাছে সত্য খবর পৌঁছে দিন
বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর শহরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা পুরাতন বাজারের কাছেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলার প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন—বারুইপুর জোড়া শিবমন্দির। আধুনিক কংক্রিটের ভিড়ে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই জোড়া শিবমন্দির কেবল একটি পূজার স্থান নয়, বরং অষ্টাদশ শতকের বাংলার সমৃদ্ধ পোড়ামাটি বা টেরাকোটা (Terracotta) শিল্পরীতির জীবন্ত দলিল।
মন্দিরের ঐতিহাসিক পটভূমি ও প্রতিষ্ঠা
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বা উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে স্থানীয় জমিদার বা ধর্মপ্রাণ বণিক পরিবারের উদ্যোগে এই জোড়া শিবমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন সময়ে পবিত্র আদি গঙ্গার মূল স্রোত বারুইপুরের বুক চিরে প্রবাহিত হতো। সেই নদীর তীরেই সনাতনী বিশ্বাস অনুযায়ী জোড়া শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে এই আটচালা মন্দিরদ্বয় নির্মাণ করা হয়েছিল।
দুটো মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে বিশালাকার কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ। যুগ যুগ ধরে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রত্যহ সকালে এই মন্দিরে পুজো দিয়ে নিজেদের দিন শুরু করেন।
টেরাকোটা ও আটচালা স্থাপত্যের অপূর্ব কারুকার্য
পশ্চিমবঙ্গের সনাতনী আটচালা শৈলীতে নির্মিত এই দুটি মন্দির তার সূক্ষ্ম অলঙ্করণের জন্য খ্যাত:
- প্রবেশদ্বারের টেরাকোটা প্যানেল: মন্দিরের খিলান ও বাইরের দেওয়ালে পোড়ামাটির ফলকে খোদাই করা রয়েছে রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যান।
- পৌরাণিক মোটিফ: লঙ্কাকাণ্ডে রাম-রাবণের যুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের বন্দনা এবং তৎকালীন গ্রামীণ বাংলার সমাজজীবনের দৃশ্য পোড়ামাটির প্রতিটি ইঁটে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
- চুনা-সুরকির গাঁথনি: শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ্য করেও মন্দির দুটির মূল কাঠামো আজও অক্ষত রয়েছে তৎকালীন পোক্ত চুনা-সুরকির গাঁথনির কারণে।
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও সংরক্ষণের বর্তমান দাবি
বর্তমানে আধুনিক নির্মাণের চাপে মন্দির দুটির প্রাচীন রূপ কিছুটা ঢাকা পড়লেও এর ঐতিহাসিক ও শিল্পমূল্য অপরিসীম।
- বেশ কিছু টেরাকোটা ফলক প্রাকৃতিক ক্ষয় ও অবহেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও ঐতিহ্যপ্রেমী নাগরিকদের দাবি, রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বা হেরিটেজ কমিশনের মাধ্যমে এই অমূল্য মন্দিরটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হোক।
- মন্দিরের চারপাশের চত্বর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং আলোকসজ্জা বৃদ্ধির জন্য পুরসভা ও স্থানীয় ক্লাবের তরফ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কীভাবে পরিদর্শন করবেন?
বারুইপুর জংশন স্টেশন থেকে পুরাতন বাজারগামী যেকোনো টোটো বা অটোতে উঠে পুরাতন বাজার মোড়ে নামলেই পায়ে হেঁটে মাত্র ২ মিনিটে এই জোড়া শিবমন্দিরে পৌঁছানো যায়। শান্ত সকালে বা বিকেলে মন্দিরটি ঘুরে দেখলে প্রাচীন বাংলার কারুশিল্পের এক অপূর্ব অনুভূতি পাওয়া যায়।
ঐতিহ্য বার্তা: অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের প্রতিটি নাগরিকের পরম দায়িত্ব।

শুভ্রনীল নস্কর(Subhranil Naskar)
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক • মহকুমা প্রশাসন, নগরোন্নয়ন ও রাজনীতি
দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও বারুইপুর মহকুমার সমাজ, পৌর রাজনীতি ও আঞ্চলিক উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক। দীর্ঘ ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে মহকুমার জনস্বার্থ ও অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতায় যুক্ত।